«

»

Nazrul

ক্ষণজন্মা সোনার মানুষ

বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্যের পথিকৃৎ জহুরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৫ সালের এ দিনে আমরা হারিয়েছি ক্ষণজন্মা এই ‘সোনার মানুষ’কে। মহত্ত্ব, কৃতিত্ব, পরিশ্রম, সততা, একনিষ্ঠতা এবং আত্মবিশ্বাস তাকে ‘সোনার মানুষে’ পরিণত করেছিল। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জন্য তিনি সোপান তৈরি করে গেছেন। শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাকে খাটো করা হয়। একজন সমাজ সংস্কারক, সফল সংগঠক, ব্যবস্থাপকের মডেল তিনি। সততা, পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং ধর্মবোধের সমন্বয়ে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব অর্জন করেছিলেন জহুরুল ইসলাম। তবে তা অলৌকিক নয়। তার সব অর্জনই সম্পন্ন হয়েছে লৌকিকতায়, শ্রমে এবং মেধায়। বিনিয়োগ, উৎপাদন তথা উন্নয়নের যে গতিময়তার জ্যোতি তিনি ছড়িয়ে গেছেন তার সুফল এ দেশ ও দেশের মানুষ অনন্তকাল ভোগ করবে। এ দেশে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। পশ্চিমা ধনী আদমজী, ইস্পাহানী, দাউদদের অসহযোগিতা মোকাবিলা করে তিনি এদেশীয় ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন।কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভাগলপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জহুরুল ইসলামের জন্ম। তার বাবা আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন কিশোরগঞ্জের এক সজ্জন ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন বাজিতপুরের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান। এলাকার জনহিতকর কর্মকাণ্ডে তার ছিল উল্লেখযোগ্য অবদান। আর মা রহিমা আক্তারের পুণ্যতা, দানশীলতা, বদান্যতা আজও ওই এলাকার মানুষের মুখে মুখে প্রশংসিত। জহুরুল ইসলামের কর্মের ঝলক কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশের সীমানা ডিঙিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকেও আলোকিত করেছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কোনো বাঙালির ব্যবসার বিস্তার ঘটানো কল্পনাকে হার মানানোর মতো ঘটনা। এ ছাড়া লন্ডন, বাংলাদেশ বা যে কোনো দেশের একটি অফিসে বসে তিনি বিভিন্ন দেশের অফিস পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতেন দক্ষতার সঙ্গে। আজকের যুগেও যা অনেকের সাধ্যের বাইরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও শহরে সেবামূলক কোনো পদ্ধতি-প্রক্রিয়া দেখে তা দেশে তথা ঢাকায় বাস্তবায়নের উদ্যোগী হতেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায়ই তার ইস্টার্ন হাউজিং প্রতিষ্ঠা। এ উদ্যোগে ঢাকার আবাসিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি ছিল কর্মসংস্থানের এক বিশাল আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের দুয়ারও খোলে তার মাধ্যমেই। দেশের অর্থনীতির ভিত্তিতে রক্ত সঞ্চালক হিসেবে আজও দেশে-বিদেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে উচ্চারিত হয় জহুরুল ইসলামের নাম। শুধু বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানেই নয়, তার জনহিতের হাত প্রসারিত হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, ব্যাংক, কৃষি, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন খাতে। মানুষের পাঁচ মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রতিটিক্ষেত্রেই তিনি ও তার প্রতিষ্ঠানের অবদান বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।মুঘল আমলের মধ্যভাগে জহুরুল ইসলামের পূর্ব পুরুষদের এ দেশে আগমন। তিন ভাই বাজেত খাঁ, ভাগল খাঁ ও দেলোয়ার খাঁ মুঘল শাহের দরবারি প্রতিনিধি হয়ে এই এলাকায় আসেন। পরবর্তীতে বাজেত খাঁর নামানুসারে হয় বাজিতপুর। ভাগল খাঁর নামানুসারে ভাগলপুর ও দেলোয়ার খাঁর নামানুসারে নামকরণ হয়েছে বর্তমান দিলালপুর। জহুরুল ইসলাম ভাগল খাঁর পরিবারের ত্রয়োদশ বংশধর। শৈশবে জহুরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ‘সোনা’। এই আদুরে সোনাই একদিন হয়েছেন সোনার বাংলার সোনার মানুষ। পারিবারিক উত্তরাধিকারে ভর না করে কর্মফলের মাধ্যমে ছোট থেকে বড় হওয়ার দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ভাগ্যান্বেষণে সততা-পরিশ্রম-আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ কত মহীয়ান হতে পারেন তিনিই সেই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি আরও কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে কর্মক্লান্ত হননি। ওই কর্মব্যস্ততায় বহুমুখী আরও কিছু পরিকল্পনা ছিল তার। জহুরুল ইসলামের বিশালত্ব অসাধারণ, বহুমুখী, বিস্ময়কর, বৈচিত্র্যময়। অতি সাধারণের মধ্য থেকে এবং সাধারণকে নিয়েই তিনি হয়েছেন অসাধারণ। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী শেষ করে কিছুদিন সরারচর শিবনাথ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ভর্তি হন বাজিতপুর হাইস্কুলে। কিছুদিন পর চাচা মহকুমা প্রকৌশলী মুর্শিদ উদ্দিনের সঙ্গে চলে যান কলকাতায়। সেখানে ইংরেজি মাধ্যমে কলকাতা রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করেন। এরপর ভর্তি হন বর্ধমান জেলার এক কলেজে। সেখান থেকে চলে আসেন মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। প্রতিকূল পরিবেশ ও পারিবারিক দায়দায়িত্বের চাপে তার লেখাপড়া আর এগোয়নি।

তার কর্মজীবন শুরু ১৯৪৮ সালে। মাসিক ৮০ টাকা বেতনে সিঅ্যান্ডবির ওয়ার্ক এসিসট্যান্ট হিসেবে চাকরি পান। তিন বছর পর ১৯৫১ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। সরকারি অফিসে স্টেশনারি সরবরাহের ব্যবসাও করেছেন। পশ্চিমাদের রাজত্বে তখন সীমিত পুঁজিতে কোনো বাঙালির ঠিকাদারি বা ব্যবসার কথা ভাবনায় আসাও ছিল অস্বাভাবিক। ঠিকাদারি জীবনের শুরুতে তিনি কিশোরগঞ্জ পোস্ট অফিস নির্মাণের কাজ পান। পরবর্তীতে পান গুলিস্তান থেকে টিকাটুলী সড়কের কাজ। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কাজের সততা, গুণ ও মানে মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার বাবার ১৩ সদস্যের পরিবারকে নিয়ে আসেন রাজধানী ঢাকায়। ভাই-বোন সবাইকে উচ্চশিক্ষা করেন। এই ১৩ সদস্যের একান্নবর্তী পরিবার একসময় রূপ নেয় বিশাল এক পরিবারে, যা তিনি ধরে রেখেছিলেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এ ঘটনা আমাদের পারিবারিক ও সমাজ বাস্তবতায় আরেক বিস্ময়কর ঘটনা। স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ছিলেন তার জীবনের অগ্রযাত্রার সহযাত্রী, তথা অনুপ্রেরণা। অন্তরদৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি_ এই দুই দৃষ্টির সমন্বয়ে জহুরুল ইসলামের মধ্যে ছিল দ্বিমুখী মননশীলতা। কাছে-দূরে সমানতালে দেখা, বর্তমানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এ দ্বিমুখী ক্ষমতাকে অনেকে ঐশ্বরিক মনে করেন।

আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও একাত্তরের যুদ্ধে জহুরুল ইসলামের অবদান দেশের ইতিহাসেরই অংশ। তিনি ফলাও করে বা প্রচারের উদ্দেশ্যে কখনো ওই অবদানের কথা উল্লেখ করতেন না। বরাবরই দান-অনুদানের মতো মহৎ কাজে তিনি গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। তার সেই মহত্ত্ব প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর লেখা, ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ নামক গ্রন্থে কিছু উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জহুরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের ১০ জুন ঢাকা ত্যাগ করে লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি সুবেদ আলী ছদ্মনাম ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কার্যক্রম চালাতে থাকেন। সেই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ প্রদান করেন। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খানের লেখা ‘স্বৈরাচারের দশ বছর’ গ্রন্থেও উল্লেখ আছে। জহুরুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান সরকারের জেলে আটক নেতাকর্মীদের মোকদ্দমার এবং আহতদের চিকিৎসার খরচ জোগাতেন। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন তিনি। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে নীরবে-নিভৃতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুরুল ইসলাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জহুরুল ইসলামের ছিল ব্যক্তিগত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু তাকে ‘হাজী সাহেব’ নামে ডাকতেন। বিনয়, উদারতা, আতিথেয়তা, পরোপকার ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ছিল জহুরুল ইসলামের ছোটবেলা থেকেই। পরবর্তীতে কর্মজীবনে এসব বৈশিষ্ট্যের আরও বেশি প্রকাশ ঘটেছে। কখনো তিনি একা খেয়েছেন, এমন নজির খুব কম। খাওয়ার টেবিলে মানুষ কম থাকলে তিনি খাওয়ায় আগ্রহ পেতেন না। এ দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবীসহ সৃষ্টিশীলদের সঙ্গে ছিল তার আত্মার সেতুবন্ধ। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ, অগ্রযাত্রা এবং সৃষ্টিশীল কাজে তিনি সহযোগিতা করেছেন উদারভাবে। সেসব সহায়তা, দান- অনুদানের কথাও তিনি প্রকাশ করতেন না। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার খুব ঝোঁক ছিল। কর্মময়-জীবনে তিনি ছিলেন মোহামেডান ক্লাবের অন্যতম সদস্য। মোহামেডানের উন্নয়নে তার অবদান ছিল বিস্তর। ‘নাভানা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’ তার ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি প্রীতিময়তার এক স্মারক। ধর্মানুরাগী জহুরুল ইসলাম দ্বীন-দুনিয়াকে আলাদাভাবে দেখতেন না। তিনি মনে করতেন দুনিয়া দ্বীনের বাইরে নয়, আবার দ্বীনও দুনিয়ার বাইরে নয়। জীবনের সবকিছু দ্বীনের আওতায়। দেশপ্রেমকেও তিনি দেখতেন দ্বীন-দুনিয়ার অংশ হিসেবে। সেই চেতনা থেকেই তিনি নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আদায় করতেন উদার মনে। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানা নির্মাণের পাশাপাশি সমাজ ও দেশগঠনে সচেষ্ট ছিলেন দুর্বারগতিতে। এ দুর্বার পথচলা ও কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যেও তাকে কখনো নামাজ কাজা করতে দেখা যায়নি।

বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্যের পথিকৃৎ জহুরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯৫ সালের এ দিনে আমরা হারিয়েছি ক্ষণজন্মা এই ‘সোনার মানুষ’কে। মহত্ত্ব, কৃতিত্ব, পরিশ্রম, সততা, একনিষ্ঠতা এবং আত্মবিশ্বাস তাকে ‘সোনার মানুষে’ পরিণত করেছিল। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জন্য তিনি সোপান তৈরি করে গেছেন। শুধু ব্যবসায়ী-শিল্পপতি পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাকে খাটো করা হয়। একজন সমাজ সংস্কারক, সফল সংগঠক, ব্যবস্থাপকের মডেল তিনি। সততা, পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা এবং ধর্মবোধের সমন্বয়ে এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব অর্জন করেছিলেন জহুরুল ইসলাম। তবে তা অলৌকিক নয়। তার সব অর্জনই সম্পন্ন হয়েছে লৌকিকতায়, শ্রমে এবং মেধায়। বিনিয়োগ, উৎপাদন তথা উন্নয়নের যে গতিময়তার জ্যোতি তিনি ছড়িয়ে গেছেন তার সুফল এ দেশ ও দেশের মানুষ অনন্তকাল ভোগ করবে। এ দেশে ব্যবসা এবং ব্যবসায়ীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অগ্রণী ভূমিকায়। পশ্চিমা ধনী আদমজী, ইস্পাহানী, দাউদদের অসহযোগিতা মোকাবিলা করে তিনি এদেশীয় ব্যবসা ও ব্যবসায়ীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন।

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার বর্ধিষ্ণু গ্রাম ভাগলপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জহুরুল ইসলামের জন্ম। তার বাবা আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন কিশোরগঞ্জের এক সজ্জন ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন বাজিতপুরের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান। এলাকার জনহিতকর কর্মকাণ্ডে তার ছিল উল্লেখযোগ্য অবদান। আর মা রহিমা আক্তারের পুণ্যতা, দানশীলতা, বদান্যতা আজও ওই এলাকার মানুষের মুখে মুখে প্রশংসিত। জহুরুল ইসলামের কর্মের ঝলক কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, বাংলাদেশের সীমানা ডিঙিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকেও আলোকিত করেছে। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কোনো বাঙালির ব্যবসার বিস্তার ঘটানো কল্পনাকে হার মানানোর মতো ঘটনা। এ ছাড়া লন্ডন, বাংলাদেশ বা যে কোনো দেশের একটি অফিসে বসে তিনি বিভিন্ন দেশের অফিস পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করতেন দক্ষতার সঙ্গে। আজকের যুগেও যা অনেকের সাধ্যের বাইরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও শহরে সেবামূলক কোনো পদ্ধতি-প্রক্রিয়া দেখে তা দেশে তথা ঢাকায় বাস্তবায়নের উদ্যোগী হতেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায়ই তার ইস্টার্ন হাউজিং প্রতিষ্ঠা। এ উদ্যোগে ঢাকার আবাসিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি ছিল কর্মসংস্থানের এক বিশাল আয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তির কর্মসংস্থানের দুয়ারও খোলে তার মাধ্যমেই। দেশের অর্থনীতির ভিত্তিতে রক্ত সঞ্চালক হিসেবে আজও দেশে-বিদেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে উচ্চারিত হয় জহুরুল ইসলামের নাম। শুধু বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানেই নয়, তার জনহিতের হাত প্রসারিত হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, ব্যাংক, কৃষি, ক্রীড়াসহ বিভিন্ন খাতে। মানুষের পাঁচ মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা প্রতিটিক্ষেত্রেই তিনি ও তার প্রতিষ্ঠানের অবদান বিশ্বে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মুঘল আমলের মধ্যভাগে জহুরুল ইসলামের পূর্ব পুরুষদের এ দেশে আগমন। তিন ভাই বাজেত খাঁ, ভাগল খাঁ ও দেলোয়ার খাঁ মুঘল শাহের দরবারি প্রতিনিধি হয়ে এই এলাকায় আসেন। পরবর্তীতে বাজেত খাঁর নামানুসারে হয় বাজিতপুর। ভাগল খাঁর নামানুসারে ভাগলপুর ও দেলোয়ার খাঁর নামানুসারে নামকরণ হয়েছে বর্তমান দিলালপুর। জহুরুল ইসলাম ভাগল খাঁর পরিবারের ত্রয়োদশ বংশধর। শৈশবে জহুরুল ইসলামের ডাকনাম ছিল ‘সোনা’। এই আদুরে সোনাই একদিন হয়েছেন সোনার বাংলার সোনার মানুষ। পারিবারিক উত্তরাধিকারে ভর না করে কর্মফলের মাধ্যমে ছোট থেকে বড় হওয়ার দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ভাগ্যান্বেষণে সততা-পরিশ্রম-আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ কত মহীয়ান হতে পারেন তিনিই সেই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি আরও কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে কর্মক্লান্ত হননি। ওই কর্মব্যস্ততায় বহুমুখী আরও কিছু পরিকল্পনা ছিল তার। জহুরুল ইসলামের বিশালত্ব অসাধারণ, বহুমুখী, বিস্ময়কর, বৈচিত্র্যময়। অতি সাধারণের মধ্য থেকে এবং সাধারণকে নিয়েই তিনি হয়েছেন অসাধারণ। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী শেষ করে কিছুদিন সরারচর শিবনাথ হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ভর্তি হন বাজিতপুর হাইস্কুলে। কিছুদিন পর চাচা মহকুমা প্রকৌশলী মুর্শিদ উদ্দিনের সঙ্গে চলে যান কলকাতায়। সেখানে ইংরেজি মাধ্যমে কলকাতা রিপন হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করেন। এরপর ভর্তি হন বর্ধমান জেলার এক কলেজে। সেখান থেকে চলে আসেন মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। প্রতিকূল পরিবেশ ও পারিবারিক দায়দায়িত্বের চাপে তার লেখাপড়া আর এগোয়নি।

তার কর্মজীবন শুরু ১৯৪৮ সালে। মাসিক ৮০ টাকা বেতনে সিঅ্যান্ডবির ওয়ার্ক এসিসট্যান্ট হিসেবে চাকরি পান। তিন বছর পর ১৯৫১ সালে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। সরকারি অফিসে স্টেশনারি সরবরাহের ব্যবসাও করেছেন। পশ্চিমাদের রাজত্বে তখন সীমিত পুঁজিতে কোনো বাঙালির ঠিকাদারি বা ব্যবসার কথা ভাবনায় আসাও ছিল অস্বাভাবিক। ঠিকাদারি জীবনের শুরুতে তিনি কিশোরগঞ্জ পোস্ট অফিস নির্মাণের কাজ পান। পরবর্তীতে পান গুলিস্তান থেকে টিকাটুলী সড়কের কাজ। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কাজের সততা, গুণ ও মানে মাত্র দুই বছরের মাথায় তিনি নিজেকে একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার বাবার ১৩ সদস্যের পরিবারকে নিয়ে আসেন রাজধানী ঢাকায়। ভাই-বোন সবাইকে উচ্চশিক্ষা করেন। এই ১৩ সদস্যের একান্নবর্তী পরিবার একসময় রূপ নেয় বিশাল এক পরিবারে, যা তিনি ধরে রেখেছিলেন ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এ ঘটনা আমাদের পারিবারিক ও সমাজ বাস্তবতায় আরেক বিস্ময়কর ঘটনা। স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ছিলেন তার জীবনের অগ্রযাত্রার সহযাত্রী, তথা অনুপ্রেরণা। অন্তরদৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি_ এই দুই দৃষ্টির সমন্বয়ে জহুরুল ইসলামের মধ্যে ছিল দ্বিমুখী মননশীলতা। কাছে-দূরে সমানতালে দেখা, বর্তমানকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এ দ্বিমুখী ক্ষমতাকে অনেকে ঐশ্বরিক মনে করেন।

আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও একাত্তরের যুদ্ধে জহুরুল ইসলামের অবদান দেশের ইতিহাসেরই অংশ। তিনি ফলাও করে বা প্রচারের উদ্দেশ্যে কখনো ওই অবদানের কথা উল্লেখ করতেন না। বরাবরই দান-অনুদানের মতো মহৎ কাজে তিনি গোপনীয়তা রক্ষা করতেন। তার সেই মহত্ত্ব প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর লেখা, ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ নামক গ্রন্থে কিছু উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জহুরুল ইসলাম ১৯৭১ সালের ১০ জুন ঢাকা ত্যাগ করে লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি সুবেদ আলী ছদ্মনাম ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কার্যক্রম চালাতে থাকেন। সেই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ প্রদান করেন। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খানের লেখা ‘স্বৈরাচারের দশ বছর’ গ্রন্থেও উল্লেখ আছে। জহুরুল ইসলাম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় পাকিস্তান সরকারের জেলে আটক নেতাকর্মীদের মোকদ্দমার এবং আহতদের চিকিৎসার খরচ জোগাতেন। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেন তিনি। এভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে নীরবে-নিভৃতে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন জহুরুল ইসলাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে জহুরুল ইসলামের ছিল ব্যক্তিগত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু তাকে ‘হাজী সাহেব’ নামে ডাকতেন। বিনয়, উদারতা, আতিথেয়তা, পরোপকার ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য ছিল জহুরুল ইসলামের ছোটবেলা থেকেই। পরবর্তীতে কর্মজীবনে এসব বৈশিষ্ট্যের আরও বেশি প্রকাশ ঘটেছে। কখনো তিনি একা খেয়েছেন, এমন নজির খুব কম। খাওয়ার টেবিলে মানুষ কম থাকলে তিনি খাওয়ায় আগ্রহ পেতেন না। এ দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবীসহ সৃষ্টিশীলদের সঙ্গে ছিল তার আত্মার সেতুবন্ধ। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ, অগ্রযাত্রা এবং সৃষ্টিশীল কাজে তিনি সহযোগিতা করেছেন উদারভাবে। সেসব সহায়তা, দান- অনুদানের কথাও তিনি প্রকাশ করতেন না। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তার খুব ঝোঁক ছিল। কর্মময়-জীবনে তিনি ছিলেন মোহামেডান ক্লাবের অন্যতম সদস্য। মোহামেডানের উন্নয়নে তার অবদান ছিল বিস্তর। ‘নাভানা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’ তার ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি প্রীতিময়তার এক স্মারক। ধর্মানুরাগী জহুরুল ইসলাম দ্বীন-দুনিয়াকে আলাদাভাবে দেখতেন না। তিনি মনে করতেন দুনিয়া দ্বীনের বাইরে নয়, আবার দ্বীনও দুনিয়ার বাইরে নয়। জীবনের সবকিছু দ্বীনের আওতায়। দেশপ্রেমকেও তিনি দেখতেন দ্বীন-দুনিয়ার অংশ হিসেবে। সেই চেতনা থেকেই তিনি নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আদায় করতেন উদার মনে। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানা নির্মাণের পাশাপাশি সমাজ ও দেশগঠনে সচেষ্ট ছিলেন দুর্বারগতিতে। এ দুর্বার পথচলা ও কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যেও তাকে কখনো নামাজ কাজা করতে দেখা যায়নি।


এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

মার্ক জুকারবার্গকে নিয়ে অজানা কিছু তথ্য
পাঁচ জেলার সেরা ৫ ফ্রিল্যান্সারের সফলতার কথা
বিল গেট্স যে সব জায়গায় টাকা ফুরাতে রাজী নন
মৃত্যু ব্যবসায়ী থেকে শান্তির প্রতিষ্ঠাতা
নিয়ে নিন ভেরিফ্যাই Skrill accounts সাথে নিয়ে নিন আসল NameLess International Masters Card (physically...
স্বাধীনতার এই মাসের সেরা অফার একটি ভেরিফ্যাই Skrill accounts আমদের কাছে থেকে নিলেই আপনি পাবেন Inter...
নিয়ে নিন আপনার INTERNATIONAL MASTER CARD (PHYSICALLY CARD) ( আমাদের বিশেষ ৪ টি প্যাকেছ থেকে নিয়ে নিন...

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

Nazrul

Nazrul

Md. Nazrul Islam Bsc. DUET (Electrical) (Diploma Gutter BAFA) (Mashinist German TTC) Businessman

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/successful-biography/nazrul/14189

মন্তব্য করুন