«

»

অনুপম শুভ্র

দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া… সৌরজগত ও মহাবিশ্ব।

আমাদের পৃথিবী কি অনন্যা? এই মহাবিশ্বে এমন গ্রহ কি আর একটিও নেই? আমাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিলে যে গ্রহটির, সেটিই বা কেমন? সেখানে কি আমাদের মতো প্রাণের অস্তিত্ব আছে? থাকলে ওরাও কি আমাদের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী? এসব প্রশ্ন বহু পুরোনো। উত্তরটাও বদলায় না খুব একটা, পৃথিবীর বাইরে ঠিক পৃথিবীর মতো গ্রহ পাওয়া যায়নি; কিন্তু বিরাট মহাবিশ্বে এমন গ্রহ থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি। এসব প্রশ্নের উত্তরটা একটু বদলে দিতে নাসা একটি নতুন অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছে। পৃথিবীর অনন্যতার প্রশ্নে আরেকটু নির্দিষ্ট উত্তর খোঁজাই এই কেপলার অভিযানের লক্ষ্য। আগামী নভেম্বরেই নাসা এ অভিযান পরিচালনা করতে যাচ্ছে। এ নিয়ে বেশ মজার কিছু আয়োজনও করছে নাসা।

অনন্যা পৃথিবী
পৃথিবী যে মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় কোপারনিকাস, কেপলার ও গ্যালিলিও এটা জানিয়েছিলেন তাও ৪০০ বছর হতে চলল। ১০০ বছরেরও কম সময় আগে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে মহাবিশ্বের কেন্দ্রের আশপাশে সুর্যের অবস্থান নয়। কোটি কোটি নক্ষত্রের ছায়াপথের মতোই আরও কোটি কোটি ছায়াপথ আছে এই মহাবিশ্বে। মহাবিশ্বের কোনো কেন্দ্রই নেই। কোটি কোটি গ্রহ আর নক্ষত্রে বিচিত্রতা থাকতেই পারে। পৃথিবীর বাইরেও হয়তো পৃথিবীর মতো ভিন্ন কোনো গ্রহের অস্তিত্ব রয়েছে। আর এই আশার হাতছানিতেই প্রাণের সাড়া পেতে মঙ্গল চষে বেড়াচ্ছে মানুষের চোখ। শুধু মঙ্গল কেন, নতুন পৃথিবীর খোঁজে অত্যাধুনিক সব টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে মানুষ চলে যাচ্ছে তারা থেকে তারায়, কখনো বা ছায়াপথের সীমানা ছাড়িয়ে। এর মধ্যে কয়েকটি গ্রহ নানা দিক দিয়ে মিলেও যাচ্ছে পৃথিবীর সঙ্গে। তাই পৃথিবীর বাইরের এসব নতুন দুনিয়া ঘিরে বাড়ছে মানুষের প্রত্যাশা।
পৃথিবী তথা সৌরজগতের বাইরে পৃথিবীর মতো ভিন্ন কোনো দুনিয়া আছে। সেখানে প্রাণের স্পন্দন আছে, আছে জীবনের অস্তিত্ব। ওখানকার প্রাণের ছোঁয়া হয়তো অন্য রকম। হতে পারে পৃথিবীর মানুষের কল্পনার বাইরের কোনো সীমানায় এর পরিধি। প্রাণের সংজ্ঞাতেই থাকতে পারে ভিন্নতা। তার পরও পৃথিবীর মানুষ আকাশপানে তকিয়ে থাকে ভিনগ্রহী কোনো অতিথির আগমনি বার্তা পেতে। কল্পনায়ই হোক আর অবান্তর প্রত্যাশায়ই হোক, পৃথিবীর জন্নলগ্ন থেকে মানুষ আশার দানাবেঁধে আছে এই ভিনগ্রহীদের তরে। দিনে দিনে এসেছে অ্যালিয়েনের কথা। অসংখ্য বিজ্ঞান কল্পকাহিনী আর সিনেমায় দাপড়ে বেড়িয়েছে এরা। আমরা জানি এসবই কল্পনা। অন্তত এখন পর্যন্ত।
দিনে দিনে বিজ্ঞান এমন সব অভাবনীয় তথ্য-উপাত্ত তুলে আনছে, তাতে পৃথিবীর মতো ভিন্ন কোনো গ্রহের উপস্িথতির খবরও হয়তো খুব একটা অসম্ভব হবে না। আর এ জন্যই আশায় দানাবাঁধা। ভিনগ্রহে প্রাণের উপস্থিতি নিয়ে কম গবেষণা হয়নি। শত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন গ্রহ। গবেষণা হয়েছে সৌরজগতের ভেতরে ও বাইরে। সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের মধ্যে মঙ্গলের সঙ্গেই পৃথিবীর সখ্য বেশি। মঙ্গলের অনেক কিছুই পৃথিবীর সদৃশ। এ জন্য মঙ্গলের তরে মানুষের প্রত্যাশাও বেশি। অনেক গবেষণা উপাত্ত মঙ্গল দাপড়ে বেড়াচ্ছে মানুষের দ্বিতীয় বসতির আশায়। সৌরজগতের গ্রহের সঙ্গে পৃথিবীর কিছুটা মিল থাকতেই পারে, এগুলোর অভিন্ন নক্ষত্রের কারণে। কিন্তু সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ যদি হয় পৃথিবীর মতো। কল্পনার পরিধি একধাপে এতটা বাড়াতে বিজ্ঞানীরাও খুব বেশি সাহস করেননি। তাই বলে তাঁরা থেমে থাকেননি। এখনো দাপড়ে বেড়াচ্ছেন মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জীতে।

কেপলার অভিযান
কেপলার অভিযানে বিশেষ মহাকাশযানটি অন্তত এক লাখ নক্ষত্র চষে বেড়াবে পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের সন্ধানে। নক্ষত্রগুলোর আলোক বিচ্ছুরণ থেকে এটি প্রাথমিক বাছাই করবে। পৃথিবীর মতো গ্রহ খোঁজায়ও কিছু প্রশ্ন আছে এখনো, যেগুলো কেপলারের কাছেও পরিষ্ককার না এখনো। পৃথিবীর সঙ্গে কতটুকু মিল থাকলে আমরা পৃথিবীর মতো গ্রহ বলব অথবা কোন কোন দিকে মিল খুঁজব, সেটাও একটা প্রশ্ন কেপলারের কাছে। আকারে বা পাথুরে গঠন হয়তো মিলতে পারে; কিন্তু সেই গ্রহের ধারক নক্ষত্র থেকে দুরত্ব কিংবা বাতাস ও পানির ব্যাপারটি আসবে এর পরে। কেপলারের বিভিন্ন বিষয় চুড়ান্ত হয় ২০০১ সালে। এ জন্য নাসার খরচ হচ্ছে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। কেপলারের মূল অংশ দুরবীক্ষণ লেন্সের সঙ্গে শক্তিশালী ও বিশেষায়িত ক্যামেরা।

পৃথিবীর বাইরে আরেক পৃথিবী
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি সৌরজগতের বাইরে এমন একটি গ্রহের খোঁজ পেয়েছেন, যার সঙ্গে পৃথিবীর অনেক মিল রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে আকার-আকৃতি, এমনকি তাপমাত্রায়ও পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যেতে পারে গ্রহটির অনেক কিছুই। নতুন পাওয়া এ গ্রহটিতে জলের অস্তিত্বও থাকতে পারে। আর মহাকাশীয় দুরত্বের তুলনায় সৌরজগৎ থেকে এটি খুব দুরেও নয়। পৃথিবী থেকে ১২০ ট্রিলিয়ন মাইল দুরের লোহিত নক্ষত্রপুঞ্জকে ঘিরে আবর্তন করছে গ্রহটি। আর লোহিত এ নক্ষত্রটির তাপমাত্রা সুর্যের চেয়ে বেশ কম। গ্রহটি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়নি। তবে এর তাপমাত্রা থেকে অনুমান করা যায় এখানে পানির উপস্িথতির কথা। পৃথিবীর কাছাকাছি বলতে মঙ্গলে যে উপাত্ত পাওয়া গেছে, তার অনেক কিছুই পাওয়া যেতে পারে নতুন গ্রহটিতে। অনেক ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে গ্রহটি মঙ্গলের চেয়েও এগিয়ে থাকতে পারে। চিলির লা সিলার ইউরোপীয় দক্ষিণাঞ্চলের পর্যবেক্ষণ দুরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সম্প্রতি খোঁজ পাওয়া এ গ্রহটির নাম গ্লিস৫৮১। টেলিস্কোপে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে উপগ্রহসহ বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে গ্রহটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
প্রাণের অস্তিত্ব তো দুরের কথা, গ্লিস৫৮১ গ্রহটি যে নক্ষত্রকে আবর্তন করে ঘুরছে, এ ধরনের লোহিত ক্ষুদ্রাকৃতির নক্ষত্রকে আবর্তনরত অবস্থায় এত বড় গ্রহ থাকতে পারে, তা এর আগে বিজ্ঞানীরা কখনো ভাবেননি। এ ধরনের নক্ষত্র মহাকাশের দুর্বল তারা হিসেবেই পরিচিত। তবে বিভিন্ন দিক ও ধর্মের কথা ভাবলে এগুলোর অনেক কিছুই আছে, যা সুর্যের সঙ্গে মিলে যায়। সুর্যের কাছাকাছি অবস্িথত গ্রহগুলোর শতকরা ৮০ ভাগই এমন লোহিত গ্রহ। আকার কাছাকাছি হলেও নতুন গ্রহটি সুর্যের তুলনায় অন্তত পাঁচ গুণ বড়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না গ্রহটির বহিরাবরণ পাথুরে, নাকি এটি কঠিন জমানো বরফাবরণে আবৃত। গ্রহটি যদি পাথুরে হয়, তাহলে এটি আকারে পৃথিবীর চেয়ে অন্তত দেড় গুণ বড় হবে। আর বরফ আবৃত হলে আকার আরও বেড়ে যাবে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রহটির নিজস্ব আবহাওয়ামন্ডল রয়েছে।

দুরের পৃথিবী
পৃথিবীর মতো পৃথিবী খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এত দিন পর্যন্ত সৌরজগতের গ্রহগুলো নিয়েই ভেবেছেন বেশি। ভিন্ন পরিবেশের আর ভিন্ন নক্ষত্রের অংশ হয়েও একটি গ্রহ যে পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যেতে পারে, তা তাঁদের কাছে অনেকটা ভাবার অতীতই ছিল। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটি গ্রহের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা এখন সাহস পেয়েছেন তাঁদের ভাবার ব্যাপ্তিতে। বছর দুয়েক আগে আমাদের ছায়াপথের একটি ছোট্ট গ্রহের অনেক কিছুই পৃথিবীর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। পৃথিবী থেকে ২৫ হাজার আলোকবর্ষ দুরের একটি লাল বামন তারাকে কেন্দ্র করে ঘোরা এ গ্রহটির নাম ওজিএলই-২০০৫-বিএলজি-৩৯০এলবি। গ্রহটির অনেক কিছু মিলে যায় প্লুটোর সঙ্গে। সবকিছুই ঠিক ছিল, বাদ সাধল এর তাপমাত্রা। পরবর্তী গবেষণায় জানা যায়, অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে মিল থাকলেও গ্রহটির তাপমাত্রা পৃথিবীর তুলনায় বেশ বেশি, ২২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

চোখ রাখুন নতুন পৃথিবীতে
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর বাইরে অন্তত ৩০০টি গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলোর সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে মিলে যায় আমাদের পৃথিবী। তবে একেবারে পৃথিবীর মতো গ্রহ পাওয়া যায়নি এখনো। এগুলোর সবই হয় বেশি ঠান্ডা নতুবা অতিরিক্ত গরম। আবহাওয়ামন্ডলেও আছে ভিন্নতা। প্রাণের অস্তিত্বের বিষয়টির প্রমাণ মিলেনি এখনো। তার পরও চলছে গবেষণা। পৃথিবীর বাইরে নতুন পৃথিবীর দিকে আছে সারা বিশ্বের চোখ। পৃথিবীর মতো নতুন গ্রহের খবরাখবর আপনিও পেতে পারেন তাৎক্ষণিকভাবে। এ জন্য আপনার কম্পিউটারে ইন্টারনেট থেকে একটি ছোট প্রোগ্রাম নামিয়ে ইনস্টল করে নিতে পারেন। ইন্টারনেট থেকে নতুন পৃথিবীর তথ্য নিয়ে এটি সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেবে আপনাকে।


এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

অনুপম শুভ্র

অনুপম শুভ্র

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/science-tech/0shuboo/31918

1 comment

  1. এ.এস.ডি

    সুন্দর একটি লেখা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া

মন্তব্য করুন