«

»

সাইন্স ফিকশন-২: ধূসর স্বপ্ন

প্রফেসর মাহমুদ শফিক পদার্থ বিজ্ঞানের যুগান্তকারী সব আবিষ্কার করেছেন। তাঁর আবিষ্কার মানবসভ্যতাকে  অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাঁর আবিষ্কৃত A-মিটার যন্ত্র বাংলাদেশকে যুদ্ধের পরাজয়ের হাত থেকে নিশ্চতরূপে বাঁচাবে। যন্ত্রটা অনেকটা রাডারের মতো কাজ করে। রাডারের সীমানার ভেতর সব অস্ত্রকে অকেজো করে দিবে A-মিটার যন্ত্রটা। সেনাবাহিনীর সব অস্ত্র আক্রমণের আগেই ধ্বংস করা যাবে, এতে কোন বোমা বা বুলেটের দরকার হবে না। তিনি যন্ত্রটার নাম দিয়েছেন ট্রিগার। এই ট্রিগারের ফলে মেশিন গানের গুলি মেশিন গানের ভেতরেই বিষ্ফোরিত হবে। কেউ যদি পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা বাংলাদেশের সীমানার ভেতর প্রবেশ করার আগেই বিষ্ফোরিত হবে। এক কথায় তাঁর আবিষ্কৃত ট্রিগার সব ধরণের যুদ্ধাস্ত্র আগেই অকেজো করে দিবে। যন্ত্রটি তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর হাতে দিয়েছেন। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি বলে কিছু থাকল না।

ব্যাপারটা ভাবতেই প্রফেসর মাহমুদ শফিক চরম আনন্দিত হলেন। পরক্ষণেই আরেকটা ব্যাপার তাঁর মনে পড়ে গেল, হাসি-খুশি ভাবটা চলে গেল। মাতৃভূমির অর্থনৈ্তিক দূরাবস্থার কথা ভাবতেই তাঁর মন বিষিয়ে গেল। বিদেশী শক্তির হাতে ট্রিগার টেকনোলজি বিক্রি করে দিলেও কোন লাভ হবেনা। বিক্রির টাকা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তার আগেই সেটা ভাগ হয়ে যাবে বিভিন্ন রাজনৈ্তিক দলের সদস্যদের মঝে। তাছাড়া বিশ্বের শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন হবে। তাই তিনি সেটা হতে দেননি। ট্রিগারকে চালু করার বেসিক কোড তিনি ছাড়া আর কেউ জানেন না।

সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে তিনি কিছুই করতে পারছেন না, ব্যাপারটা ভাবতেই তাঁর বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো। তিনি একা চেষ্টা করে কোন লাভ হবেনা দূর্নীতি দেশের অস্থিমজ্জায় ঢুকে গেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেশকে সামনের দিকে এগোতে দিচ্ছে না। তার উপর আবার দেশের খনিজ সম্পদের সিংহভাগই একচেটিয়াভাবে বিদেশীদের হাতে চলে যাচ্ছে। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ-এর অবস্থা মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বেকারত্ব বাড়ছে, বাড়ছে হতাশা। সেই সাথে বাড়ছে সন্ত্রাস। দেশের যুবসমাজ নেশার অন্ধকারে দুবে যাচ্ছে। এসব চিন্তা করে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। কিন্তু তিনি কি করতে পারেন! তিনি একজন বিজ্ঞানী মাত্র। প্রযুক্তি নিয়েই তাঁর কাজ়। তাছাড়া তিনি একাই কতোদিক সামলাবেন?

অনেক কিছু ভেবে প্রফেসর মাহমুদ শফিক একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি একটা টাইম মেশিন বানাবেন। তারপর চলে যাবেন দু’শো বছর পরের সময়ে। নিজের চোখেই দেখবেন প্রিয় বংলাদেশের অবস্থা। প্রেস-কনফারেন্সে জানাবেন তিনি যা দেখে এসেছেন। এছাড়া আর কোন উপায় নেই।

কিন্তু টাইম মেশিন কি বানানো যাবে? অনেকে অনেক রকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে তাঁর আত্মবিশ্বাস খুব প্রবল। তিনি যা ভাবেন তা-ই করেন। তাঁর মেধা আছে, খরচের জন্যও কোন সমস্যা হবেনা। কিন্তু সমস্যা একটাই, এই প্রজেক্টের কথা কাউকে বলা যাবেনা। সেটাও এড়িয়ে যাওয়া যাবে, তিনি বলবেন একটা যুগান্তকারী আবিষ্কার করতে যাচ্ছেন। এতেই সবাই সন্তুষ্ট হবে। কারও বিরক্তির কোন কারণ নেই।

(২০ বছর পর…)

দেশের অবস্থা আগের থেকে অনেক খারাপ হয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু সীমাহীন দূর্নীতি আর রাজনৈ্তিক দলীয়করণের জন্য তা সাধারণ মানুষের কাছে ভালোভাবে পৌঁছেনি। তাঁর প্রজ়েক্টের কাজ এখন মোটামুটি অর্ধেকের দিকে। তিনি টাইম মেশিন আবিষ্কার করেছেন। তবে তাঁর মনের মতো করে বানাতে পারেন নি। এই মেশিন দিয়ে তিনি শুধুমাত্র একবারই ভবিষ্যতে যেতে পারবেন ও বর্তমানে ফিরে আসতে পারবেন।

২০৩০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি টাইম মেশিনে উঠলেন। ঘড়ির কাটা ফিক্সড করলেন ২২৩০ সালের দিকে। তাঁর টাইম মেশিনটা দেখতে দেখতে কাঁচের গোলকের মতো। মাঝখানে একটা বসার সিট্‌, সামনে কন্ট্রোল প্যানেল। প্রফেসর মাহমুদ শফিক কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকলেন। একধরণের অস্থিরতা কাজ করছিল, সেটা দূর হয়ে গেল।  তিনি স্থির হলেন। দু’শ বছর পরের সব কিছুর ভিডিও ক্লিপ্‌স বর্তমানের সবাইকে দেখানোর জন্য একটি ভিডিও ক্যামেরা সাথে নিতে ভুলেন নি। অবশেষে চালু করে দিলেন তাঁর টাইম মেশিন। কাঁচের গোলকটা আস্তে আস্তে ঘুরতে শুরু করল। তবে তিনি ও তাঁর বসার চেয়ার এবং কন্ট্রোল প্যানেল ঠায় স্থির থাকল। পাঁচ মিনিট পর কাঁচের গোলকটা প্রচন্ড বেগে ঘুরতে শুরু করল। দশ মিনিটের মধ্যে সেখানে একটা বিস্ফোরণ ঘটল। টাইম মেশিন পাড়ি দিয়েছে দু’শ বছর পরের ভবিষ্যতে।

আবার আরেকটি হালকা বিস্ফোরণ। টাইম মেশিন চলে এসেছে ২২৩০ সালে। এটাই এখন তাঁর বর্তমান। কিছুক্ষণ পর টাইম মেশিনটি পুরোপুরিভাবে থামল। মেশিনটির দরজা খুলে বের হলেন প্রফেসর মাহমুদ শফিক। সামনের দিকে তাকালেন তিনি। তিনি একটা স্টেডিয়ামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘড়িতে সময় তখন সকাল দশটা। আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি মনের মধ্যে কিছুটা ভয় অনুভব করেলেন। কাঁধে ভিডিও ক্যামেরার ব্যাগটি ঝুলিয়ে তিনি স্টেডিয়ামের বাইরে চলে এলেন। গেট দিয়ে বেড়িয়েই তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। চারদিকে অসম্ভব নীরব পরিবেশ। রাস্তায় কোন যানবাহন নেই। আজ কি তবে হরতাল?

কিছুক্ষণ পর তিনি দেখলেন, কয়েকজন মানুষ রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তিনি দৌড়ে সেখানে গেলেন। বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনীর এক চেয়ারে একজন বসে আছেন। তার কাছে গেলেন তিনি। লোকটাকে শিক্ষিত বলেই মনে হলো। প্রফেসর মাহমুদ শফিক একটা জিনিস খেয়াল করে অবাক হলেন এবং সেটাকে ক্যামেরাবন্দী করলেন। আশেপাশে কোন গাছপালা নেই।

লোকটার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

-“ভাই সাহেব, মানুষজন দেখছি না। ব্যাপারটা কী?”

লোকটা অবাক হয়ে তাকাল তাঁর দিকে। তারপর বলল,

-“আপনি জানেন না? নাকি ফাজলামি করতে এসেছেন?”

-“না ভাই, আমি সত্যিই জানিনা। আমাকে একটু খুলে বলুন না।”

-“এখন আর বলে কী লাভ হবে?” লোকটা কিছুক্ষণ মাথা নাড়ল।

-“তারপরেও বলুন না, প্লিজ…”

লোকটা বলা শুরু করল।

-“ঢাকা শহরে আর মানুষ থাকেনা। পানি নেই। সব গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। রাতে বিদ্যুৎ থাকেনা। সবকিছুর একটা সীমা থাকে। আমরা সে সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করে ফেলেছি। গ্যাসের সংকটের জন্য গাছ কাটা শুরু হয়েছিল। ঢাকা শহরের প্রায় সব গাছ শেষ। এখানকার প্রায় সব মানুষ গ্রামে ফিরে গেছে। শুধুমাত্র যাদের অঢেল টাকা আছে, তারাই এখানে থেকে গেছে। চড়া দামে সব কিছু কিনে কোন রকমে বেঁচে আছে আরকি! তবে তারাও এখানে বেশিদিন টিকতে পারবে না। সরকার বলতে আর কিছু নেই। সব পালিয়েছে বিদেশে। রাজনীতির হাত ধরে ধনী হয়েই ওরা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। সোমালিয়ার মতো একটা গরীব দেশে পরিণত হয়েছি আমরা।”

এই বলে লোকটা থামল। তারপর কিছুক্ষণ কাঁদল। আবার বলতে শুরু করল।

-“পানি, গ্যাসের অপচয় করেছি আমরা। তারপরেও যা ছিল তা বিক্রি করে দিয়েছি বিদেশীদের কাছে। আমাদের সব সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে তারা। নিজেদেরকেও সৎ রাখিনি আমরা। কখনো আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা চিন্তা করিনি। নিজের সাথে সাথে দেশকেও করেছি দূর্ণীতিগ্রস্থ। প্রকৃ্তির কাছ থেকে এর থেকে আর কি আশা করতে পারি আমরা?”

লোকটি চেয়ার থেকে উঠে হাসতে হাসতে চলে গেল সামনের দিকে। প্রফেসর মাহমুদ শফিক লোকটির সব কথা রেকর্ড করলেন। পায়ে হেঁটে হেঁটে যতদূর সম্ভব তিনি সব রেকর্ড করলেন। তাঁর আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে। তিনি হেঁটে চলছেন একটি ব্যাস্ততম শহরের রাস্তা দিয়ে। যেখানে একসময় মানুষের বসবাস ছিল। চারদিক ছিল কোলাহলে পরিপূর্ণ। এখন এটা প্রায় মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। দেশের দক্ষীণাঞ্চল সমুদ্রে তলিয়ে গেছে। চূড়ান্ত আভিশাপ নেমেছে দেশটার উপর।

এই আবস্থা থেকে মুক্তির কী আর কোন পথ নেই? পথ অবশ্যই আছে, এটাই তার উপযুক্ত সময়। কারণ তাঁর কাছে যথেস্ট প্রমাণ আছে, তা না হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ত্ব থাকবে না। তাকে এখনই অতীতে ফিরে যেতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে সর্তক করে দিতে হবে। সবাইকে দেখাতে হবে এবং বোঝাতে হবে। তিনি এবার দৌড়াতে লাগলেন। আকাশ কালো হয়ে আছে, এখুনই বৃষ্টি নামবে। তিনি আরো জোড়ে দৌড়াতে লাগলেন। স্টেডিয়ামে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি চমকে উঠলেন। টাইম মেশিনটি সেটার জায়গায় নেই। আশেপাশে তিনি কোথাও সেটিকে খুঁজে পেলেন না। হঠাৎ তাঁর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি এখানে থাকতে এসেছিলেন এক ঘণ্টার জন্য। তিনি ঘড়িতে তাকালেন, সময় সাড়ে এগারটা। হায় ঈশ্বর! এক ঘন্টা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। টাইম-স্পেসের হিসেব মতে টাইম মেশিন ধ্বংস হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেছে। প্রফেসর মাহমুদ শফিক ধপাস্‌ করে মাটিতে বসে পড়লেন। হাত থেকে পড়ে গেল ভিডিও ক্যামেরাটা। এমন সময় ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। আকাশে বিদুৎ চমকাল। চারদিক সাদা আলোতে ভেসে গেল।

সেই সাদা আলোতে দেখা গেল একটা পরিত্যক্ত ও মৃত শহরকে। যেটি একসময় একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী ছিল।©

(পূর্বে  ই-পৃথিবী’র ফেব্রুয়ারী-২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত)

এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

N.C.

"প্রযুক্তির সাথে কথোপকথন..." স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলা ভাষার আইটি ও বিজ্ঞান বিষয়ক অনলাইন ম্যাগাজিন মাসিক "আইটি রিভিউ"। ভিজিট করুনঃ http://www.sciencetech.info/

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/science-fiction/n-c/3057

7 comments

Skip to comment form

  1. ঐ ছেলেটি
    jakir

    সুন্দর। আপনি ভালো সাইন্সফিকশন লিখতে পারেন।

    1. N.C.

      সবই আপনাদের দোয়া…

  2. Ranty

    Vi .mobile theke porlam kintu kahini suru hoyar age sesh hoya gelo.operamini diye pray ordek porte parlam na.tai boro lekha vag kre dile valo hoy

    1. N.C.

      OK… এরপর থেকে চেষ্টা করবো। ধন্যবাদ…

  3. রাসেল

    ভালো লাগলো……..ধন্যবাদ

    1. N.C.

      সুস্বাগতম…

  4. md.rifat bara

    সুন্দর………।।

মন্তব্য করুন