«

»

ধারাবাহিক বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি “ঘরে ফেরার গান” (ক্রম- ২)

 

 


“তুমি কিভাবে বুঝলে আমি এখানে?” মাইক জানতে চাইল।

“তোমার ঘর খালি দেখে মনে হল তুমি হয়তো এখানে।”

মাইক কিছুই বলল না, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

সানি তরল গলায় হেসে প্রশ্ন করল, “আমি কখনো বুঝতে পারি না তুমি কেন প্রতিদিন অর্থহীনভাবে এখানে বসে সূর্যাস্ত দেখ?”

মাইক কিছু না বলে শুধু হাসল।

“তুমি যে অর্বাচীনের মত কাজ কর, এটা তো কোন বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।” সানি এবার যেন একটু কঠোর হল। এবারও মাইক কিছু বলল না। শুধু হাসল। বয়স্করা শিশুদের মজার মজার প্রশ্ন শুনে যেভাবে হাসে মাইকও ঠিক সেভাবেই হাসল।

 

“তুমি কি মনে কর, তোমার এই অদ্ভুত আবেগের কোন মানে আছে?” সানি জানতে চায়। ওরা তখন ডান দিকের সিঁড়িঁ বেয়ে নেমে সামনের ছোট্ট হলঘরে এসে হাজির হলো।

 

ঢুকতেই দেখা গেল সাইরাজ প্রাচীন বৃক্ষের ফসিল দিয়ে বানানো আসনে বসে গোলাকৃতি গ্রানাইটের টেবিলের উপর মাথা ঠেকিয়ে রয়েছে।

 

মাইক আর সানি অনুরূপ আসনে বসে পড়ল। শব্দ শুনে সাইরাজ মাথা তুলে একবার ওদের দিকে তাকায় তারপর, চেয়ারে হেলান দিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে ছাদ দেখতে থাকে। হঠাৎ-ই সানির দিকে তাকিয়ে ডাকল, “সানি।”

 

“কি?”

“একটা কথা শুনবে?” সাইরাজ সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে।

“বল।”

“তোমার কি মনে হয় আমাদের এই বদ্ধ জীবনের কোন অর্থ আছে? কোন মুক্তি আছে?”

 

সাইরাজের গলাল স্বরে এক ধরনের হাহাকারের আভাস পাওয়া যায়। ক্ষণিকের জন্য হলেও মাইক আর সানি থমকে যায়।

মাইক উঠে এসে সাইরাজের পাশে বসে পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, “না সাইরাজ সেটা সত্যি নয়।”

“কেন?”

“যখন মানুষের কোন কিছুু করার আকক্সক্ষা থাকে না, যখন মানুষের সামর্থ বলতে অবশিষ্ট আর কিছুই থাকে না, শুধু তখনই মানুষের জীবন অর্থহীন হয়ে যায়। মানুষের হাত গুটিয়ে থাকতে হয়।” মাইকের গলাও ধরে আসে, আবেগতাড়িত হয়ে বলে ওঠে, “আমাদের এখনও অনেক কিছু করার আছে?”

“কি করার আছে?”

“বেঁচে থাকার জন্য আমাদের অনেক কিছুই করতে হবে। প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের নতুন নতুন বিপদ মোকাবেলা করতে হবে?”

“আমরা কি শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকব?”, সাইরাজ যেন আবারও হতাশ হয়ে পড়ল।

সাইরাজের প্রশ্নের উত্তর মাইক দিতে পারে না। তবুও সাইরাজ বলে, “কার জন্য সমস্যার মোকাবিলা করব?”

“অনাগতদের জন্য।”

“অনাগতদের জন্য ?” সাইরাজের চোখে বিস্ময় ফুটে ওঠে। তারপর অপার্থিব ভঙ্গিতে হেসে পাল্টা প্রশ্ন করে, “তোমার কি মনে হয় পৃথিবীর অবস্থা আবার আগের মতো হবে? মানুষ আবার পথে হাঁটবে ? খোলা প্রান্তরে শুয়ে রাতের আকাশ দেখবে?” সাইরাজ প্রায় কেঁদেই ফেলল। দু’হাত দিয়ে সে তার নিজের গাল দু’টো চেপে ধরল।

“দেখবে।” মাইক সান্ত্বনা দেয়, “আমি প্রতিদিন এ স্বপ্ন দেখি। দেখতে আমার ভাল লাগে।”

“মিছে স্বপ্ন দেখো না মাইক, গত বিশ বছর ধরে আমরা শুধুমাত্র এই একটি ভবনের মাঝেই আটকে আছি। বিশ বছর আগে এখানে একটি সুন্দর বসতি ছিল, মানুষের কোলাহলে জনপথ ছিল মুখরিত, আর মানুষের মধ্যে ছিল প্রাণ ভরা ভালবাসা।”

“মানুষের মধ্যে এখনও ভালোবাসা আছে। ভালোবাসা কখনও হারিয়ে যায় না।”

“থাক না সে সব কথা।” মাইক বাধা দেয়।

“না থাকবে কেন? তেজস্ক্রিয়তার জন্য কয়েকদিনের মধ্যেই দশ হাজার জনসংখ্যা এসে দাঁড়ালো মাত্র হাজারে, আর তারপর থেকে বন্দী। বাইরে বেড়াতে হলে তেজস্ক্রিয় নিরোধক পোষাক পড়তে হয়। সমুদ্র এত কাছে থাকার পরও আমারা সেখানে নামতে পারি না। ছুঁতে পারি না, শুধু দূর থেকে দেখেই পৃথিবীর আশা করতে পারো?” একটা দীর্ঘ লাইন চরম হতাশ কণ্ঠে বলে মাইককে জড়িয়ে ধরে।

মাইক কিছুক্ষণ পিঠে হাত বুলিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলে, “হ্যাঁ পারি। কারণ বেঁচে থাকতে হলে স্বপ্ন দেখতে হবে। মানুষ স্বপ্ন দেখতো বলে একসময় সে সভ্যতার শীর্ষে, স্বর্ণশিখরে উঠতে পেরেছিল।”

“আর পরিণামে সে পৃথিবীকে শেষ করে দিল।” সাইরাজ মাইকের কথা শেষ করতে দেয় না।

 

যখন আবেগতাড়িত কথা বলতে সবারই চোখে জল এসে যায় ঠিক তখনই মহামান্য জ্যাক জে শ্র“ফ, যিনি পৃথিবীর এই একমাত্র মনুষ্যবসতির প্রধান, প্রচণ্ডবেগে আলোচনা কক্ষে প্রবেশ করেন। প্রবেশ করেই তিনি চিৎকার করে ওঠেন। মহামান্য জ্যাক জে শ্র“ফের জন্য ব্যাপারটি প্রায় স্বাভাবিক, তবুও সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল।

 

সানি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল, “কী হয়েছে, মহামান্য?”

মাইক জানতে চাইল, “মহামান্য কেন আপনি গত দু’সপ্তাহ নিজেকে গবেষণায় আটকে রেখেছিলেন? আমরা ভেবেছিলাম আপনি বোধ হয় আপনার গবেষণা নিয়ে কোন দূর্ঘটনায় পড়েছেন। আমরা নিশ্চিত হবার জন্য হয়তো অচিরেই আপনার গবেষণাগারের দরজা ভেঙ্গে ফেলতাম।”

“ওহ! কি আনন্দ, আমি কি আগে কখনও এটা ভাবতে পেরেছি, নাকি কোন মানুষ কোনদিন পেড়েছে?”

 

মহামান্য জ্যাক জে শ্র“ফের কণ্ঠে তখন খুশির প্রতিচ্ছবি আর চোখে তখন আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। তিনি কথা শেষ করার আগেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সানিকে জড়িয়ে ধরলেন, যে বেশিরভাগ সময়েই মহামান্যের মাত্রাতিরিক্ত আনন্দের বহিঃপ্রকাশের শিকার হয়। যখন তিনি সানিকে ছেড়ে দিলেন তখন সে জানতে চাইল, “মহামান্য এসবের মানে কি?”

 

মহামান্য’র মুখ তখন রক্তিমাভ, চুল অগোছালো অথচ চেহারার মধ্যে বিরাজ করছিল অপ্রাকৃতিক উত্তেজনা। তার চোখ একই সঙ্গে পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং ক্লান্ত। “দুদিনের মধ্যেই আমরা সবাই পৃথিবী ছেড়ে চলেযেতে পারি। দু’বছরের মধ্যে সুবিশাল মহাশূন্যযান তৈরি করে অনন্ত মহাশূন্যযাত্রা করতে পারি। ভাগ্য ভালো হলে আমাদের কোন প্রজন্ম হাজার বছরের মধ্যে বসবাস উপযোগী কোন গ্রহ পেয়ে যেহে পারে। সেখানে মানুষ পৃথিবীর মতোই স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে পারবে।” এক নাগাড়ে না থেমে মহামান্য কথাগুলো বলে ফেললেন।

 

সাইরাজ এতক্ষণ কোন কথা বলেনি। এবার সে বলল, “মহামান্য ক্ষমা করবেন, আপনি কি এটা প্রমাণ করতে পারবেন যে আমরা এই পৃথিবী থেকে বের হতে পারব।” আসলে সে অনিশ্চিতভাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

 

“আমি এটা প্রমাণ করতে পারব, এটা সত্যি। তবে তার আগে আমার কথা শোন সবাইকে ঘণ্টাখানিকের মধ্যে হলঘরে চলে আসতে বল। সবাইকে একসঙ্গে বলি।” কথা শেষ হওয়া মাত্রই যেমনভাবে হঠাৎ করে ঘরে ঢুকেছিলেন, তেমনি প্রায় দৌড়ে বের হয়ে গেলেন।

(ভাল কিংবা খারাপ অথবা বিরক্তিকর যা-ই লাগুক আপনারা মন্তব্য করুন। আপনাদের মন্তব্য আমাকে আরও ভাল কিছু লিখতে উৎসাহ দিবে।)

 

 

আমার ব্লগে আপনাকে স্বাগত জানাই- (mahkbd.blogspot.com)


এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

মুহাম্মাদ আনোয়ারুল হক খান

আমার জন্ম পিরোজপুরে নানা বাড়িতে। দাদা বাড়িও পিরোজপুরে। পিরোজপুর শহরের সার্কিট হাউজ – ফায়ার সার্ভিস এর মাঝখানে আমাদের বাড়ি। পিরোজপুর আমার কাছে স্বপ্নের শহর। যদিও ক্লাস থ্রী থেকে আমি ঢাকাতে মানুষ। এসএসসি ১৯৯৬ সালে। পড়াশুনা করেছি ফার্মেসিতে, পরে এমবিএ করেছি আন্তর্জাতিক বিপননে। জুলাই ১৫, ২০১১ থেকে সব ধরনের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে অবসর নিয়েছি। বিশেষ ব্যক্তিত্বঃ নবিজী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যে ব্যক্তিত্ব আমাকে টানেঃ ডঃ মুহম্মদ ইউনুস প্রিয় লেখকঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, হুমায়ুন আহমেদ, হেনরি রাইডার, জুল ভান প্রিয় টিভি সিরিয়ালঃ Spellbinder, Spellbinder 2: Land of the Dragon Lord, The girl from tomorrow, Tomorrows end, Time Trax, MacGyver, Alice in Wonderland, The Chronicles of Narnia প্রিয় টিভি নাটকঃ কোথাও কেউ নেই, অয়োময়, রুপনগর, বহুব্রিহী, বার রকম মানুষ প্রিয় টিভি শোঃ ইত্যাদি, সিসিমপুর, Pumpkin Patch Show লেখালেখি আমার শুধু শখই না, মনে হয় যেন রক্তের টান। বিশেষ করে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি। বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি আমার কাছে রঙ্গিন ঘুড়ির মত। কল্পনার সীমানা পেরিয়ে যে ছুটে চলে মহাজগতিক পরিমণ্ডলে। এ যেন সময়টাকে স্থির করে দিয়ে এর আদি-অন্ত দেখার মত। তারপরও এ ঘুড়ি যেমন ইচ্ছে তেমন উড়তে পারে না, সুতোয়ে টান পড়ে বলে। এ টান যুক্তির টান। যৌক্তিক কল্পনা বললে ভুল হয় না। তারপরও নিজ ইচ্ছেয়ে সুতোটাকে ছিঁড়ে দিতে ভাল লাগে মাঝে মাঝে। আমি যেমন নিজে স্বপ্ন দেখি তেমনি সবাইকে স্বপ্ন দেখাতে চাই। অঞ্জন দত্তের ভাষায় বলতে হয়, ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যখন-তখন কান্না পায়, তবু স্বপ্ন দেখার এই প্রবল ইচ্ছাটা কিছুতেই মরবার নয়।’ কনফুসিয়াসের এই লাইন টা আমাকে খুব টানে ... journey of a thousand miles begins with a single step। আমার প্রথম লেখা প্রকাশ হয় ১৯৯৬ সালে আধুনালুপ্ত বিজ্ঞান সাপ্তাহিক আহরহ তে। আমার নিজের একটা ব্লগ আছে, mahkbd.blogspot.com। আমার ইমেইল mahkbd@gmail.com।

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/science-fiction/mahkbd/23331

1 comment

  1. jamalsee

    thanks, for something different topics.
    buy sony vita

মন্তব্য করুন