«

»

দুই দশকের লিনাক্স – আমাদের লিনাক্স

লিনাক্সকে ভভালোবাসি, ভালোবাসি প্রযুক্তিকে। তাই তো প্রযুক্তির নিয়ে লিনাক্স নিয়ে কিছু দেখলেই শেয়ার করতে ইচ্ছে করে। আজ প্রথম আলোতে মুনির হাসানের সুন্দর একটি লেখা প্রকাশ হয়েছে লিনাক্স নিয়ে। তাই এখানে শেয়ার করলাম আপনাদের সাথে। ভালো লাগবে। কারন লিনাক্স আমাদের আর লিনাক্স আমাদের জন্যই।

২৫ আগস্ট, ১৯৯১। ইউজনেটের কম্প ডট ওএস ডট মিনিক্স (comp.os.minix) নিউজগ্রুপে একটি বার্তা প্রকাশ করেন ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। তাঁর প্রকাশিত বার্তার সারকথা হলো: তিনি ৩৮৬ কম্পিউটারের জন্য একটি মুক্ত বা ফ্রি অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেছেন। শখের বশে। এপ্রিল থেকে কাজ করছেন। এটি দিয়ে তিনি জিসিসি [gcc(1.40)] এবং ব্যাশ

[/bash]

পোর্ট করে কাজ করেছেন। সেগুলো কাজ করে! এর মানে হলো, কাজ করে এমন কিছু কয়েক মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। কাজেই সেখানে কে কী চান, তাঁকে বলা যায়। তবে সেগুলো যে তিনি করবেনই, এমন কোনো নিশ্চয়তা তিনি দেননি!
লিনাসের ওই অপারেটিং সিস্টেমটি সবার সুবিধার জন্য একই বছরের সেপ্টেম্বরে একটি ফাইল সার্ভারে রাখা (আপলোড) হয়। লিনাসের সহপাঠী ও সহকর্মী অঁরি লেমাক প্রকল্পটির নাম দেন ‘লিনাক্স’। যদিও শুরুতে লিনাস প্রকল্পের নাম দিয়েছিলেন ফ্রিয়্যাক্স (FREAX)।
ইউজনেটের ব্যবহারকারীরা বা হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শিক্ষার্থী লিনাস টোরভাল্ডস কি জানতেন, এই ‘ছোট্ট’ উদ্যোগ মাত্র এক দশকের মধ্যে তাঁকে কোন জায়গায় নিয়ে যাবে? ২০০০ সালে বিশ্বখ্যাত টাইম সাময়িকী বিশ শতকের ১০০ জন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের একটি তালিকা প্রকাশ করে। লিনাস তাতে ১৭তম স্থান অধিকার করেন!
বিদ্যুতের আসা-যাওয়াকে ভিত্তি করে যদি কখনো কোনো গণনাযন্ত্র তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি এক দিন লাপ্লাসের বিশ্বদানবের মতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠতে পারে—এ বিশ্বাস অনেক বিজ্ঞানীর থাকলেও বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও অনেকের ভাবনায় আজকের কম্পিউটার-জগৎ ছিল না। কিন্তু ট্রানজিস্টরের আবিষ্কার, মার্কিন আদালতের চাপাচাপি, জেরক্সের গবেষণাগারে মাউসের উদ্ভাবন এবং কয়েকজন স্বপ্নচারী লোকের চেষ্টায় আশির দশক থেকে কম্পিউটার মানুষের চিন্তা-চেতনা আর কর্মজগতে নানা ধরনের পরিবর্তন আনতে শুরু করে। কিন্তু দিন শেষে কম্পিউটার আসলে গাড়ি বা টেলিভিশনের মতো কতগুলো উপকরণের সমন্বয় মাত্র। গাড়ি বা টেলিভিশনের সঙ্গে তার মৌলিক পার্থক্য হলো এর কাব্যিকতা। জানা শব্দ আর বাক্য দিয়ে কবি যেমন এক নতুন জগৎ গড়ে তুলতে পারেন, সে রকম কম্পিউটারও তার উপকরণের জগৎকে ছাড়িয়ে যেতে পারে, যেটি এর আগের কোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী পারেনি। কারণ, কম্পিউটারকে প্রোগ্রাম করা যায়! প্রোগ্রাম মানে হলো কতগুলো নির্দেশনা, যা দিয়ে কম্পিউটারের নিষ্প্রাণ উপকরণগুলো হয়ে ওঠে ছন্দময়। কাজেই শেষ পর্যন্ত কম্পিউটার দিয়ে হাতি-ঘোড়া কী মারা যাবে, সেটা নির্ভর করে প্রোগ্রামেরই ওপর। তাহলে প্রোগ্রামের এমন একটি অংশ থাকে, যা কিনা এসব লোহালক্কড়ে প্রাণ সৃজন করে। কম্পিউটারের লোকেরা এদের ‘অপারেটিং সিস্টেম’ বলে। অপারেটিং সিস্টেমের ব্যাপারটা এখন নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন সব ইলেকট্রনিক যন্ত্রের প্রাণভোমরা।
কম্পিউটারের নির্মাতা, এর ব্যবহারকারীভেদে এই অপারেটিং সিস্টেমের নানা তরিকা হতে থাকে। সে রকমই একটি অপারেটিং সিস্টেম হলো ইউনিক্স, যা কি না কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত বড় বড় ব্যবস্থায় প্রাণসঞ্চার করে। আশির দশকে ইউনিক্স ঘরানার বেশ কয়েকটি অপারেটিং সিস্টেম চালু ছিল। লিনাস যখন তাঁর স্নাতকোত্তর শ্রেণীর পড়াশোনা শুরু করেন, তখন তাঁকেও এই ইউনিক্স নিয়ে কাজ করতে হয়েছিল। সে সময় তিনি নিজের জন্য একটি অপারেটিং সিস্টেম বানানোর কথা ভাবেন। এটি কোনো ব্যতিক্রমী ভাবনা ছিল না। সে সময় নিজের কাজের সুবিধার্থে অপারেটিং সিস্টেমকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার কাজটা অনেককেই করতে হতো। তবে অন্যদের সঙ্গে লিনাসের পার্থক্য হলো, তিনি তাঁর যেটুকু দরকার, সেটুকু নিজের চাহিদামতো (কাস্টমাইজেশন) না করে সর্বজনীন কিছু একটা তৈরির চেষ্টা করেন এবং সফল হোন। তাঁর দ্বিতীয় ও আকর্ষণীয় ব্যাপার হলো, তাঁর কাজটি যাতে সবাই ব্যবহার করতে পারে, সেটিকে পরিবর্তন করতে পারে তিনি সেই উদ্যোগও নেন। কারণ, তিনি জানতেন, ‘নলেজ ইজ নট পাওয়ার, শেয়ারিং নলেজ ইজ পাওয়ার!’
এখানে লিনাস টোরভাল্ডস হয়ে ওঠেন আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির যাজকদের মতো, যাঁরা হাতে লিখে জ্ঞানের পুঁথি ছড়িয়ে দিয়েছেন সবার মধ্যে; হয়ে ওঠেন আমাদের দেশের কৃষকদের মতো, যাঁরা নিজেদের নতুন প্রজাতির ধানের বীজ অন্যকে দিতে দ্বিধা করেন না।

সেই থেকে লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম হয়ে উঠেছে গণমানুষের অপারেটিং সিস্টেম। ১৯৯১ সালে লিনাসের লেখা কয়েক পাতার প্রোগ্রামিংসংকেত (সোর্স কোড) থেকে ২০০৯ সালে এটির আকার হয়েছে ৩৭০ মেগাবাইটের বেশি। শুরুর দিকে লিনাস শুধু অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল বোঝানোর জন্য ‘লিনাক্ম’ নামটি ব্যবহার করতেন। অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল কিন্তু একটি কম্পিউটারকে শেষ পর্যন্ত কাব্যময় করতে পারে না। এর আরও অনেক কিছু দরকার হয়, যেমন—কম্পাইলার, শেল, এডিটর ইত্যাদি। ১৯৮৪ সালে মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কার্নেল ছাড়া এ রকম বেশ কিছু সফটওয়্যার তৈরি হয়ে যায়। কাজেই লিনাসের কার্নেল বলা চলে মুক্ত সফটওয়্যারের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে বসে পড়ে। আর সেভাবে লিনাক্সকে কেন্দ্র করেই মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ছড়াতে শুরু করে। শুরুতে অনেকে এডিটর, কম্পাইলার, মেইল ইত্যাদি নিয়ে যে পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ তৈরি হতো, সেটির অন্য নাম দেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিনাক্সই হয়ে ওঠে সবকিছুর সমার্থক।
১৯৯৬ সালে টাক্স নামের পেঙ্গুইন হয় লিনাক্সের প্রতীক।তবে পেঙ্গুইনের নির্বাচনটি কাকতালীয়। প্রতীক নির্বাচনের আলোচনায় লিনাস অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরায় চিড়িয়াখানায় গিয়ে পেঙ্গুইনের বাচ্চার কামড় খাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ল্যারি ইউয়িং সেখান থেকে পেঙ্গুইন আমদানি করেন!
শুরুর দিকে লিনাক্সকর্মীদের মূল লক্ষ্য ছিল সার্ভার চালানোর সফটওয়্যার। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সেটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। একসময় লিনাক্স ব্যবহারকারী বললে ফুটে উঠত এক কম্পিউটার গিকের ছবি, উসকোখুসকো চুল, ভারী পাওয়ারের চশমা আর কম্পিউটার কি-বোর্ডে ঝুঁকে লিখছে নানা নির্দেশ। কিন্তু ২০০০ সাল থেকে চিত্রটি পরিবর্তন হতে থাকে। এখন ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, নোটবুক কিংবা স্মার্টফোনকে লিনাক্সে চালানো যায়।
শুরুতে যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমনই ‘জনগণের জন্য জনগণের দ্বারা জনগণের সফটওয়্যার’ হিসেবে রয়ে গেছে লিনাক্স। বিশ্বের হাজার হাজার প্রোগ্রামার, ডিজাইনার, হ্যাকার, টেস্টার মিলে প্রতিনিয়ত উন্নত করছে মুক্তদর্শনের এই ভ্যানগার্ড পণ্যটিকে। এটি প্রকাশিত হয় মুক্ত লাইসেন্সের আওতায় এবং পাওয়া যায় বিনা মূল্যে। যে কেউ ইচ্ছে করলে এর সোর্স কোডে পরিবর্তন এনে নিজের মতো করে নিতে পারে। শর্ত শুধু এটুকু, সে যেন তার করা উন্নতিটা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়!
লিনাক্সকে ঘিরে রচিত হয়েছে, হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যারের মহাকাব্য। প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন সফটওয়্যার ও সেবা। সেই মুক্তদর্শনকে ঘিরেই বিকশিত হয়েছে একুশ শতকের ভাগ্যনিয়ন্তা ইন্টারনেট। ইন্টারনেট সচল রাখার সব সফটওয়্যারই বলা চলে মুক্তদর্শন লাইসেন্সে প্রকাশিত, যে দর্শন আজ সচল রেখেছে গুগল বা ফেসবুককে।
জয় লিনাক্স!
জয় ওপেন সোর্স!!!


এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

হটস্পট প্রযুক্তি ও ক্রিকেট।
আপনার কম্পিউটার’কে সহজেই ওয়াই-ফাই হটস্পট বানিয়ে ফেলুন আর ইচ্ছে মত আপনার ইন্টারনেট সংযোগ শেয়ার করু...
বিজয় দিবসে টরজন ভাইরাসকে মেরে এবার আমারা আমাদের কম্পিউটার কে স্বাধীন করব।
লিনাক্স এবং উবুন্টু, কার্নেল, ডিস্ট্রো এসব সম্পর্কে জেনে নি
আপনার সাইটে “আজব রেডিও” যুক্ত করুন এবং মেতে উঠুন বাংলা গানের সুরে …( মিউজিক প্রেমিক এবং প্রেমিকাদের ...
আপনি কিভাবে ফ্রিলান্সিং শুরু করবেন? 200$-400$
ডোমেইন হোস্টিং এ সেরা মাত্র ৬০০ টাকায় ২ জিবি হোস্টিং !

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

অরন্য নিলয়

নীল আকাশ ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পড়া লেখা করতে ইচ্ছে করে না :(

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/my-linux/aronno-niloy/12538

মন্তব্য করুন