«

»

সীরাতুন্নবী (সাঃ)-১১

নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন পনের বছর, তখন ফুজ্জারের যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে একদিকে কোরায়শ এবং তাদের সাথে ছিলো বনু কেনানা অন্যদিকে ছিলো কয়সে আয়নাল। কোরায়শ এবং কেননার প্রধান ছিলো হারব ইবনে উমাইয়া। বয়স এবং বংশ মর্যাদার কারণে কোরায়শের কাছে সে সম্মানের পাত্র ছিলো। বনু কেনানাও তাকে সম্মান করতো। যুদ্ধের প্রথম প্রহরে কেনানার ওপর কয়েসের পাল্লা ভারি ছিলো। কিন্তু দুপুর হতে না হতেই কয়েসের ওপর কেনানার ওপর কয়েসের কেনানার পাল্লা ভারি গেলো। এই যুদ্ধে ফুজ্জারের যুদ্ধ বলা হয়। কারণ যেহেতু এতে হরম এবং হারাম মাস উভয়ের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছিলো। এই যুদ্ধ রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও স্বয়ং করেছিলেন। তিনি তাঁর চাচাতে হাতে তীর তুলে দিতেন।

হেলফুল ফুযুল

ফুজ্জারের যুদ্ধের পর নিষিদ্ধি ঘোষিত যিলকদ মাসে হেলফুল ফুযুল সংঘটিত হয়। কয়েকটি গোত্র যেমন কোরায়শ অর্থাৎ বনি হাশেম, বনি মোত্তালেব, বনি আসাদ ইবনে আবদুল ওযযা, বনি যোহরা ইবনে কেলাব এবং বনু তাইম ইবনে মোররা এর ব্যবস্থা করেন। এরা সবাই আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন তাইমির ঘরে একত্রিত হন। এরা বয়স এবং আভিজাত্যে ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
এরা পরস্পর এ মর্মে অংগীকার করলেন যে, মক্কায় সংঘটিত যে কোন প্রকার যুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করবেন।

হোক মক্কার অধিবাসী বা বাইরের কেউ-অত্যাচারিত হলে প্রতিকার করে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয়া হবে। এ সমাবেশে রসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও উপস্থিত ছিলেন। নবুয়ত পাওয়ার পর এ ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন চুক্তিতে শরিক ছিলাম, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার পছন্দ নয়। ইসলামী যুগে সেই চুক্তির জন্যে যদি আমাকে ডাকা হতো, তবে আমি অবশ্যই হাযির হতাম।

এ চুক্তির মূল ছিলো জাহেলী যুগের যাবতীয় বে-ইনসাফী দূরীকরণ। এ চুক্তির কারণ এটাই বলা হয়েছে যে, যোবায়ের একজন লোক কিছু জিনিস নিয়ে মক্কায় এসেছিলো। আস ইবনে ওয়ায়েল তার কাছ থেকে সেই জিনিস ক্রয় করে, কিন্তু তার মূল পরিশোধ করেনি। আস ইবনে ওয়ায়ের কাছে জিনিস বিক্রেতা আবদুদ দার, মাখজুম, জামিহ,ছাহাম এবং আদীর কাছে সাহায্যে আবেদন জানায়। কিন্তু কেউ এ ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়নি। এরপর সেই লোকটি আবু কুরাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে কয়েকটি কবিতা আবৃত্ত করলো। সে কবিতায় তার প্রতি অত্যাচারের কথা বর্ণনা করা হয়েছিলো।

এতে যোবায়ের ইবনে আবদুল মোত্তালেব ছুটোছুটি শুরু করে বলেন, এই লোকটির কোন সাহায্যকারী নেই কেন? তার চেষ্টায় উল্লেখিত কয়েকটি গোত্র একত্রিত হলো। প্রথমে তারা চুক্তি করলো পরে আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছ থেকে বিক্রীত পণ্যের মূল্য আদায় করে দিল।

সংগামী জীবন যাপন

তরুণ বয়সে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দিষ্ট কোন কাজ ছিলো না। তবে বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তিনি বকরি চরাতেন। সেগুলো ছিলো বনি সা’দ গোত্রের।

কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কার বিভিন্ন লোকের বকরিও তিনি চরাতেন। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি হযরত খাদিজা (রা) বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় সফর করেন। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, খাদিজা বিনতে খোয়াইলেদ একজন অভিজাত ও ধনবতী মহিলা ছিলেন। তিনি বিভিন্ন লোককে দিয়ে পণ্য কিনতেন এবং সেসব পণ্য বিক্রি করাতেন। লাভের একটা অংশ তিনি গ্রহণ করাতেন। সমগ্র কোরায়শ গোত্রেই ব্যবসা করতো। বিবি খাদিজা নবী রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সততা, সচ্চরিত্রতা এবং নম্রতার কথা শুনে তাঁকে ব্যবসায় নিয়োগের জন্যে প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি তাঁর ক্রীতদাস মায়ছারাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রস্তাব দিলেন। বিবি খাদেজা একথাও বললেন যে অন্য লোকদের তিনি যে পারিশ্রমিক দিয়ে থাকেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক দিবেন। রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং বিবি খাদিজার ব্যবসায়িক পণ্য (তথা মসলাদী) তাঁর ক্রীতদাস মায়ছারাকে সাথে নিয়ে সিরিয়া গেলেন।

বিবি খাদিজার সাথে বিয়ে

বয়সে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাণিজ্যিক সফর থেকে ফিরে আসার পর বিবি খাদিজা লক্ষ্য করলেন,অতীতের চেয়ে এবার তাঁর অনেক বেশি লাভ হয়েছে। এছাড়া তিনি ভৃত্য মায়ছারার কাছে আল্লাহর রসূলের উন্নত চরিত্র, সততা, ন্যায়পরয়ণতা ইত্যাদি ভূরসী প্রশংসা শুনলেন। এসব শুনে মনে মনে তিনি আল্লাহর রসূলকে ভালোবাসে ফেললেন। এর আগে বড় বড় সর্দার এবং নেতৃস্থানীয় লোক বিবি খাদিজাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন প্রস্তাবই তিনি গ্রহণ করেননি। মনের গোপন ইচ্ছার কথা বিবি খাদিজা তাঁর বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহর কাছে ব্যক্ত করলেন। নাফিসা গিয়ে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বললেন। রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযি হলেন এবং তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করলেন। তাঁর চাচারা খাদিজার চাচার সাথে আলোচনা করলেন এবং বিয়ের পয়গাম পাঠালেন। এরপর বিয়ে হয়ে গেলো। এ বিয়েতে বনি হাশেম এবং মুযার গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষ করে ফিরে আসা দুই মাস পর এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বয়সে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ের মোহরানা হিসাবে বিশটি উট দিয়েছিলেন। বিবি খাদিজার বয়স ছিলো চল্লিশ বছর। তিনি বিবেক বুদ্ধি, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদায় ছিলেন সেকালায় ছিলো শ্রেষ্ঠ নারী। বিবি খাদিজার সাথে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এটা প্রথম বিবাহ। তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি।

ইবরাহীম ব্যতীত রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল সন্তান ছিলেন বিবি খাদিজার গর্ভজাত। সর্বপ্রথম কাসেম জন্মগ্রহণ করেন। এ কারণে রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হতো আবুল কাসেম বা কাসেমের পিতা। কাসেমের পর যয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা এবং আবদুল্লাহ জন্ম গ্রহণ করেন। আবদুল্লাহর উপাধি ছিলো তাইয়েব এবং তাহের। পুত্র সন্তান সকলেই শৈশবে ইন্তিকাল করেন। কন্যারা ইসলামের যুগ পেয়েছিলেন। তাঁরা সকলেই ইসলাম গ্রহণ এবং হিজরতের গৌরব অর্জন করেন। হযরত ফাতেমা (রা) ছাড়া অন্য সকলেই রসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়ই ইন্তুইকাল করেন। হযরত ফাতেমা (রা) তাঁর আব্বা রসূলুল্লাহ (স) এর ইন্তিকালের ছয় মাস পর ইন্তিকাল করেন


এ সম্পর্কিত আরো কিছু টুইট:

কুরআনের আলো
প্রথম বাংলা ইসলামিক ফোরাম "আলোর নিশান"
তাফহিমুল কুরআন - কুরআন বুঝুন, কুরনআন পড়ূন কুরআন শিখুন, কুরআন জানুন
এই রমজানে আপনার মোবাইলেকে একটি সুন্দর কোরআন শরীফ উপহার দিন
এই রমজানে সূরা আত্-তাওবাহ্ এর বাংলা অনুবাদ ডাউনলোড করে নিন (মাত্র ৬০ কিলোবাইটের PDF ফাইল)
মহানবী (সাঃ) কে অবমাননা নিয়ে কিছু কথা (পার্ট-১)
‘দৃষ্টির সীমানায় কবি স্যার শফিকুল ইসলাম’

মন্তব্য দিনঃ

comments

About the author

আশিক

Permanent link to this article: http://techtweets.com.bd/islam/rasael/10379

মন্তব্য করুন